গত বছরের জানুয়ারির শুরুতে মাঝ আকাশে আলাস্কা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট থেকে প্যানেল প্লাগ খুলে পড়ে। আর ডিসেম্বরের শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় জেজু এয়ারের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় ১৮১ জন যাত্রীর মধ্যে মাত্র দুজন বেঁচে ফেরেন। দুটো উড়োজাহাজই ছিল মার্কিন জায়ান্ট বোয়িং নির্মিত। অবশ্য এতে কোম্পানিটির দুর্ভাগ্য সীমাবদ্ধ নয়, কারণ বছরজুড়ে একের পর এক দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। কর্মীদের ধর্মঘট, ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি বছর শেষে আরেক দফা নিম্নমুখী হয়েছে বোয়িংয়ের শেয়ারদর।
এপির প্রতিবেদন অনুসারে, সর্বশেষ দুর্ঘটনার কারণ তদন্তাধীন রয়েছে এবং উড়োজাহাজ চলাচল বিশেষজ্ঞরা ২৯ ডিসেম্বরের ঘটনাকে আলোচিত নিরাপত্তা সমস্যার সঙ্গে এখনই এক করে দেখছেন না।
ডেল্টা এয়ারলাইনসের সাবেক প্রধান পাইলট ও এ খাতের পরামর্শক অ্যালান প্রাইসের মতে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স জেটলাইনারের দুটি দুর্ঘটনার সঙ্গে গত রোববারের ঘটনাকে যুক্ত করা অনুচিত। যদিও ৭৩৭ ম্যাক্সের প্যানেল প্লাগ উড়ে যাওয়ার কারণে এ মডেলের উড়োজাহাজ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছিল।
অ্যালান প্রাইস উল্লেখ করেন যে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিধ্বস্ত হওয়া বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ‘নিরাপদ হিসেবে প্রমাণিত উড়োজাহাজ’। তিনি বলেন, ‘এটি ম্যাক্স থেকে আলাদা...এটি একটি অত্যন্ত নিরাপদ আকাশযান।’
কয়েক দশক ধরে বোয়িং যুক্তরাষ্ট্রে অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ধরে রেখেছিল। কিন্তু গত বছরের একাধিক সমস্যা কোম্পানির সুনাম ও ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হয়েছে। যার প্রভাবে ২০২৪ সালে শেয়ারদর কমেছে ৩০ শতাংশেরও বেশি।
কয়েক বছর আগে ৭৩৭ ম্যাক্স দুর্ঘটনায় বোয়িংয়ের সুরক্ষার সুনাম বড়ভাবে ধাক্কা খায়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়ার উপকূলে সংঘটিত দুর্ঘটনায় ৩৪৬ আরোহী প্রাণ হারান। এরপর পাঁচ বছরে বোয়িং ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনায় ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত শর্ত না মানায় বছরজুড়ে সমালোচনা হয়েছে এ জায়ান্টের বিরুদ্ধে।
আলাস্কা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে প্যানেল উড়ে যাওয়ার ঘটনায় ফেডারেল নিয়ন্ত্রকরা বোয়িংয়ের উৎপাদনে সীমা বেঁধে দেন। তারা জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা সম্পর্কে তাদের আস্থা না আসা পর্যন্ত কোম্পানির উৎপাদনসংক্রান্ত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। আর নতুন উড়োজাহাজ বিক্রি ও সরবরাহে তারা ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসের পেছনে পড়ে গেছে।
শুধু বাহ্যিক কারণই নয়, ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বোয়িং। মাস কয়েক আগে প্রায় ৩৩ হাজার কর্মী ধর্মঘটে যান, যা কোম্পানির সর্বাধিক বিক্রীত ৭৩৭ ম্যাক্স, ৭৭৭ এয়ারলাইনার ও ৭৬৭ কার্গো প্লেনের উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। ধর্মঘট সাত সপ্তাহ স্থায়ী হয়। চার বছরে ৩৮ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব মেশিনিস্টস অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ওয়ার্কার্সের সদস্যরা মেনে নিলে ধর্মঘট শেষ হয়। এরপর পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে আসে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা।
জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) কিছু অভিযোগ স্বীকার করে নেয় বোয়িং। তখন বলা হয়েছিল, বোয়িংয়ের অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে এফএএ ইনফ্লাইট সিমুলেটর প্রশিক্ষণের পরিবর্তে কম্পিউটারভিত্তিক প্রশিক্ষণ অনুমোদন করেছিল। সিমুলেটর প্রশিক্ষণ ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে কিছু এয়ারলাইনস হয়তো এয়ারবাসের বিমানের দিকে ঝুঁকত। অবশ্য সরকারি আইনজীবীরা বলেছিলেন, দুর্ঘটনাগুলোর সঙ্গে বোয়িংয়ের প্রতারণা জড়িত তা প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট তথ্য নেই। কিন্তু ডিসেম্বরে টেক্সাসের ফেডারেল বিচারক রিড ও’কনর বোয়িংয়ের সম্মতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডাইভারসিটি, ইনক্লুশন অ্যান্ড ইকুইটি (ডিইআই) নীতির কারণে চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেন।
এসব সমস্যার মধ্যে আগস্টে সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়ান ডেভিড কালহাউন, তার স্থলাভিষিক্ত হন কেলি অর্টবার্গ। বর্তমানে সুরক্ষা ও কোম্পানির কর্মসংস্কৃতি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বোয়িং।